কাচ্চি বিরিয়ানির ইতিকথা

কাচ্চি জিনিষটার উদ্ভব মধ্য এশিয়াতে। কিন্তু সেটা আজকের কাচ্চির চেহারায় ছিলোনা। বাস্তবতা হচ্ছে কাচ্চি একটা ফিউশান খাবার। আসেন আগে কাচ্চির বেইস টা নিয়ে আলোচনা করি, যেটা একটা চাঘতাই খাবার, যার জন্ম মধ্য এশিয়াতে। তাজাকিস্তান, উজবেকিস্তানের চাঘতাইদের পছন্দ ছিলো লাল মাংস। এই লাল মাংস দিয়েই কাচ্চির প্রচলন শুরু করে শীতপ্রধাণ এই অঞ্চলের মানুষগুলি। চাল, মাখন , […]

কাচ্চি জিনিষটার উদ্ভব মধ্য এশিয়াতে। কিন্তু সেটা আজকের কাচ্চির চেহারায় ছিলোনা। বাস্তবতা হচ্ছে কাচ্চি একটা ফিউশান খাবার। আসেন আগে কাচ্চির বেইস টা নিয়ে আলোচনা করি, যেটা একটা চাঘতাই খাবার, যার জন্ম মধ্য এশিয়াতে।
তাজাকিস্তান, উজবেকিস্তানের চাঘতাইদের পছন্দ ছিলো লাল মাংস। এই লাল মাংস দিয়েই কাচ্চির প্রচলন শুরু করে শীতপ্রধাণ এই অঞ্চলের মানুষগুলি। চাল, মাখন , লবণ, গোলমরিচ (পরিমানে অতি কম, কারণ অত্যান্ত দামী বস্তু), এলাচ আর স্থানীয় মসলা জয়ফল সহযোগে একটা খাবার। তৈমুরের শাষণের শেষ দিকে যখন সমরখন্দের বারবারন্ত তখনই সম্ভবত এই খাবারটার প্রচলন হয়। সমরখন্দ শব্দটার অর্থই হলো সমরের খন্দ। চাঘতাই তুর্ক ভাষায় যার অর্থ চর্বির শহর! হ্যাঁ কাচ্চির গল্পটাও উজবেকদের কাছে সোনার চেয়েও দামী চর্বির সাথে সম্পর্কিত! এই অসম্ভব সুস্বাদু খাদ্যের বেইস হিসেবে ব্যাবহার হয়েছিলো মোটা চর্বির লেয়ার যুক্ত লাল মাংস। সাধারণত ভেড়া বা খাসির চামড়ার নিচে মাংসের উপরে মোটা চর্বির লেয়ার থাকে। গরুর লাল মাংসের ভেতরেও এতোটা স্তরীভূত চর্বি থাকে না। তাই ভেড়া বা খাসীর মাংসই আসলে কাচ্চির জন্য পারফেক্ট। তবে কাচ্চির জন্য সবচেয়ে পারফেক্ট শীতের দেশের ভেড়ার মাংস এবং তা গৃষ্মের শেষেই সবচেয়ে সুস্বাদু হয়। কাচ্চি রান্নার সময় অল্প আঁচে রান্না করার কারণে সেই মাংসের চর্বি গলে গিয়ে চালের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে কাচ্চির অপূর্ব টেক্সচারটা তৈরী করে। এর উপর ভেঙে দেয়া হতো খুবানি। এরপর তুর্কিদের মাধ্যমে সে খাবারে মেশে লবঙ্গ আর ক্ষেত্র বিশেষে হিং। চাঘতাইরা হিন্দুকুশ পার হবার আহে একটা বড় সময় অবস্থান করছিলো কাবুলে। সেখান থেকে মেশে জাফরান আর অপূর্ব কিশমিশ। গজনীর কিশমিশ।
চাঘতাইরা যাঁদের পরবর্তীতে পৃথিবী মোঘল নামে চিনবে তাঁরা ভারতবর্ষে এনেছিলো তিনটা জিনিষ। পৃথিবীর সেরা ঘোড়াগুলি, তাঁদের বিশ্বস্থ উজবেক কুকুরগুলি (যেগুলিকে আমরা নেড়ি কুত্তা বলে চিনি ) আর তাঁদের মোবাইল তান্দুরগুলি। যেগুলি ঘোড়ার রেঁকাবেই বাঁধা থাকতো! আর সেই সাথে আনলো কাচ্চির বেস। ভারতে এসেই প্রথমে কাবুলি জাফরান আর তুর্কি লবঙ্গ। মিশ্রিত হলো কাশ্মিরী জাফরান আর গোলকুন্ডার লবঙ্গ। দারুচিনি আর জয়িত্রির মাতাল করা মৌতাত কেনো বাদ থাকবে ভায়া! পাঞ্জাবের দম বিরিয়ানীর রেসিপী সামান্য হলেও কাচ্চির স্বাদ বাড়িয়ে তুললো। আর সেই সাথে আম কাঠের কয়লার অপূর্ব ঘ্রাণটা বাদ যাবে কেনো! আম কাঠের কয়লা যেনো এই অসাধারণ খাবারটাকে পূর্ণতা দিলো! মাখনের জায়গা নিলো খাঁটি ঘিঁ। আর ভারতে এসেই প্রথমবারের মতো মাংসের সাথে হাড় রেখে দেবার প্রচলন শুরু হলো। জাহাঙ্গিরের সময় ভারতে প্রথম আমদানী হয় আলু, টমেটো আর মরিচ। কাচ্চিতে আলু যোগ করা শুরু হলো তখনই। আর ঘিতে দেয়া শুকনো মরিচের ফোঁড়ন! আর আমরা পেলাম আজকের কাচ্চি!
হ্যাঁ ভাই, রেড মিট ছাড়া রান্না করলে আর যাই হোউক, কাচ্চি হয় না। প্রতি প্লেট কাচ্চির একটা আলাদা গল্প আছে। প্রতি পেল্ট কাচ্চি একটা করে এডভেঞ্চারের গল্প শোনায়। তাঁদের গল্প, যাঁদের পাতে একসময় চর্বিতে ডুবিয়ে রাখা বুড়ো ঘোড়ার মাংস আর শালগমের দুই একটা টুকরা ছাড়া আর কিছুই জুটতো না। সেই তারাই আমার পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী আর রূপকথাতূল্য এক সালতানাতের জন্মদাতা! সেই তারাই জন্ম দিয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু খাবারগুলোর।
আপনাকে কাচ্চি নিয়ে অনেকে অনেক কিছুই বলবে। আজ ব্রয়লারের কাচ্চি খাচ্ছেন, কাল হয়তো খাবেন, কবুতর, হাঁস কিংবা কোয়েলের কাচ্চি! কোন এক ক্রিসমাস ইভে কোন পাঁচ তাঁরা হোটেলের রেস্টুরেন্টে পাওয়া যাবে টার্কির কাচ্চি! কিংবা বুড়ো শুয়োরের জ্যাবজেবে মাংসের পর্ক কাচ্চি বেঁচবে কোন আন্তর্জাতিক চেইন! আপনাকে এসব ফাজলামো মেনে নিতেই হবে। কারণ আপনিই আজ মুরগীর কাচ্চি নামক অদ্ভূতস্য অদ্ভূত ফাজলামো হাঁসিমুখে মেনে নিচ্ছেন।

Written By: Papon

Photo Courtesy: Biriyani