ডেগের গোস্ত

বৃহত্তর খুলনা বা যশোর জেলায় বিশেষ করে গ্রাম অন্চলে এটি খুবই জনপ্রিয় খাবার। বিশেষ বিশেষ অনুস্ঠানে এটি রান্না হয় মুলত: গনভোজের জন্য, অনেকটা চট্টগ্রামের যিয়াফত বা মেজবানীর মতই। আমাদের গ্রামের বাড়ীতে প্রতি বছর দুই বা তিনবার এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় এবং প্রতিটা অনুষ্ঠানে কমপক্ষে দুই থেকে আড়াই হাজার লোক খাওয়ানো হয়। অনেক বৎসর যাবৎ […]

বৃহত্তর খুলনা বা যশোর জেলায় বিশেষ করে গ্রাম অন্চলে এটি খুবই জনপ্রিয় খাবার। বিশেষ বিশেষ অনুস্ঠানে এটি রান্না হয় মুলত: গনভোজের জন্য, অনেকটা চট্টগ্রামের যিয়াফত বা মেজবানীর মতই।

আমাদের গ্রামের বাড়ীতে প্রতি বছর দুই বা তিনবার এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় এবং প্রতিটা অনুষ্ঠানে কমপক্ষে দুই থেকে আড়াই হাজার লোক খাওয়ানো হয়। অনেক বৎসর যাবৎ ধারাবাহিকভাবে করার ফলে আমরা এখন খুব দক্ষভাবে এই অনুষ্ঠানগুলি সামলাতে পারি। তাছাড়া আমদের পরিবারটাও চাচাতো, ফুফাতো ও মামাতো ভাই/বোনদের দিক দিয়ে খুবই বড় এবং তারা সবাই সমাজিক ও আর্থিকভাবে খুব ভালভাবে প্রতিস্ঠিত। এছাড়া গ্রামে আমাদের বংশের লোকজনও খুবই সাহায্য করে কারন এই আয়োজনের কোন ত্রুটি হলে সেটা বংশের ইজ্জতের উপর আঘাত করবে বলে তারা বিশ্বাস করে। অর্থাৎ এই ধরনের গনভোজের অনুষ্ঠান সুষ্ঠভাবে আয়োজনের জন্যে যা যা প্রয়োজন তার সবই আমাদের কাছে বিদ্যমান।

অনুষ্ঠানের কমপক্ষে একদিন পুর্বেই সবধরনের বাজার-সওদা শেষ করা হয়। আত:পর রাতের বেলা্য কয়েকটি গরু যবাই করে কাটাকুটি করে প্রস্তুত করে রাখা হয় (কমপক্ষে ১০ মন)। এইদিকে আরেকদল বিভিন্ন মসলাপাতি যেমন পেয়াজ, রশুন, আদা, শুকনা ঝাল ইত্যাদি কেটে রাখে এবং অন্যান্য উপকরন যেমন বাটা হলুদ, ধনে বাটা, যিরা বাটা, গুড়া ঝাল, গরম মসলা ইত্যাদি প্রস্তুত করে রাখে। ভাতের দায়িত্বে থাকে আরেক দল। স্হানীয় বাজারে পরিমানমত মিস্টি দইয়ের অর্ডার দেওয়া থাকে যেটা মুল খাওয়ার পর দেওয়া হয়।

একটু বেলা হলে গোস্তগুলি কমপক্ষে ৮ বা ১০টা ডেগে করে ধারাবাহিকভাবে চুলায় চড়ানো শুরু হয়। যেহেতু অনুষ্ঠানগুলি শুক্রবারে করা হয়ে থাকে সেহেতু আমাদের টার্গেট থাকে যেন বেলা ২টা থেকে খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারটা শুরু করতে পারি নচেৎ কমপক্ষে দুই হাজার লোক খাওয়ানো সম্ভব হবে না। এইজন্য প্রথমে ৬০০/৭০০ জন পুরুষ মানুষ প্রথম ব্যাচে বসেন আমাদের বিশাল উঠানে (পান্ডেল টাংগানো থাকে)। এরপরের ব্যাচটায় বাচ্চারা ও কিছু মহিলারা। ৩য় ব্যাচে মহিলারা এবং যারা এখনও বসতে পারে নাই তারা। এরপর খাদেমগন (যারা রান্নাবান্না ও পরিবেশন করেন) আহার করে নেন। আমাদের পরিবারের একান্ত ঘনিষ্ঠজনেরা (১৫০ জনের কম হবে না) বাসার ভিতরে পালাক্রমে খেয়ে নেন। নীচে যতদুর সম্ভব ডেগের গোস্তের রেসিপিটা দিলাম:
– প্রতিটি ডেগে একমনের মত মাংস চড়ানো হয়।
– এরমধ্যে বেশী করে পেয়াজ ও সমপরিমান রশুন দেয়া হয়, এরপর আদা, শুকনা ঝাল বাটা, তেজপাতা, বাটা হলুদ, বাটা ধনে, যিরা, গরম মসলা, লবন, তেল (সর্ষের তেল হলে ভালো হয়, সয়াবিন হলেও চলবে) দিয়ে একসংগে ভালোভাবে মাখিয়ে বেশ কিছুক্ষন রেখে দেয়া হয় চুলায় চড়ানোর আগে।
– রান্নার একপর্যায়ে চুই ঝাল দেয়া হয় ।

– আপনি আলু দিতে চাইলে আগে থেকেই অর্ধেক করে কেটে হালকা ভাজি করে রাখবেন, রান্না চুলা থেকে নামানোর কিছুক্ষন আগে এই ভাজা আলুগুলি ডেগের মধ্যে দিয়ে দিবেন।

– রান্নায় সাধারনত: কোন পানি দেয়া হয় না, মাংসের পানিতেই মাংস সিদ্ধ করা হয়। তবে যদি একান্তই পানি দিতে চান তাহলে সেটা গরম করে দিবেন।

– রান্না হয়ে গেলে উপরে যিরা টেলা (যিরা শুকনা তাওয়ায় ভেজে গুড়া করা হয়) ও ধইনে পাতা কুঁচি ছড়িয়ে উত্তপ্ত কয়লার উপর ডেগটা কিছুক্ষন ঢেকে রাখা হয়, এতে তেলটা উপরে ভেসে উঠে আসে। তখন ডেগের ঢাকনাটা খুলে বিশাল হাতাওয়ালা চামচ দিয়ে সমস্হ ডেগের মাংস একবার উলটপালট করা হয়। অত:পর পুনরায় ঢেকে কয়লার উপর ডেগটা রাখা হয় পরিবেশনের আগ পর্যন্ত।

সংগে ডালও দেওয়া হয় এবং সেটিও একটা এলাহী কান্ড। কয়েকধরনের ডাল যেমন মুগ, মশুর, আড়হর, মাসকালাই, খেসারী অর্থাৎ সেই সময়ে যে যে ডাল পাওয়া যায় সেইগুলি খানিকাটা ভেজে শিলপাটায় আধছেচাঁ করে এই ডাল তৈরী করা হয়। সংগে দেওয়া হয় আলু, পুইশাক, চুইঝাল, পেপে আর পর্যাপ্ত পরিমানে ঝাল। ডালের মধ্যে খানিকটা মাংসের চর্বিও দেয়া হয় স্বাদ বাড়ানোর জন্যে।

বাসার ভিতর যারা থাকেন অর্থাৎ আমাদের নিকট আত্নীয় ও বন্ধু-বান্ধবদের জন্য অতিরিক্ত থাকে কয়েকপ্রকারের মাছ, দেশী মুরগী, কয়েকধরনের সব্জী দিয়ে তৈরী একধরনের ঘন্ট (এরমধ্যে শোল মাছ কেটে দেয়া হয় যেটি ঝোলে পরিনত হয়ে তরকারীর স্বাদ বাড়িয়ে দেয়)।

হিন্দুদের জন্যে আলাদা করে খাসীর মাংসের ব্যাবস্হা করা হয়।