পুরান ঢাকার খাদ্য খানা

আমি পুরান ঢাকার মেয়ে।’ঢাকাইয়া মাইয়া’ যাকে বলে আরকি।এই গোত্রের নারীবর্গের দজ্জ্বালপনা আর বৈচিত্র্যপূর্ণ (?) সাজ পোষাক নির্ভর রম্যনাটকের খাস ঢাকাইয়া সংলাপ যেমন মুখোরোচক তেমনই মুখোরোচক টু দ্য পাওয়ার ইনফিনিটি হল ঢাকাইয়া খাবার। ভোজন রসিক মাত্রই স্বীকার করতে বাধ্য যে পুরান ঢাকার খাদ্য খানা স্বাদতালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করবে। রান্না করতে ইচ্ছা করছে না আজকে একটুও।ওয়েলসের […]

আমি পুরান ঢাকার মেয়ে।’ঢাকাইয়া মাইয়া’ যাকে বলে আরকি।এই গোত্রের নারীবর্গের দজ্জ্বালপনা আর বৈচিত্র্যপূর্ণ (?) সাজ পোষাক নির্ভর রম্যনাটকের খাস ঢাকাইয়া সংলাপ যেমন মুখোরোচক তেমনই মুখোরোচক টু দ্য পাওয়ার ইনফিনিটি হল ঢাকাইয়া খাবার। ভোজন রসিক মাত্রই স্বীকার করতে বাধ্য যে পুরান ঢাকার খাদ্য খানা স্বাদতালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করবে।
রান্না করতে ইচ্ছা করছে না আজকে একটুও।ওয়েলসের চরম উত্তর দিকে একা একা বসে বসে খুব বেশি মিস করছি সেইসব চিরচেনা রসনাভিরাম সুখাদ্য।তাই ভাবলাম একা কষ্ট পেয়ে লাভ কি? তার চেয়ে বরং সবার রসনাতেই কিঞ্চিত প্রক্ষালন ঘটাই।

পুরান ঢাকার খাদ্য খানার মধ্যে যে কয়টি কিংবদন্তী আছে তার মধ্যে কয়েকটি হল হাজীর বিরিয়ানী,নান্না মিয়ার মোরগ পোলাও,পাগলার গেলাসি ইত্যাদি।”হাজীর বিরিয়ানীর আর আজকাল কোয়ালিটি ভাল নাই” এইসব হেনতেন কথা চুপসে ফুটা বেলুন হয়ে যাবে যদি ভোর বেলা অথবা সন্ধ্যাবেলা নাজিরাবাজারের ঐ ছোট্ট দোকানের সামনে লাইনের দৈর্ঘ্য দেখেন কেউ।হাজীর বিরিয়ানীর সাথে আমার সখ্য খুব ছোটকাল থেকে।সরিষার তেলে খাসীর ছোট ছোট টুকরো মিশিয়ে রাঁধা কাঁঠাল পাতার কাঠায় জড়ানো তেহারী ধরণের বস্তুটাকে সংজ্ঞায়িত করাই একটা ধৃষ্টতা!পাগলার গেলাসি হল খাসির মাংসের একটা কোর্মা জাতীয় পরিবেশনা।আমার বাবা এইটার বিশেষ ভক্ত।আর নান্না মিয়া যে দারূন রান্না করতেন তার সাক্ষ্য এখনো দিয়ে যাচ্ছে তার নামে নামায়িত মোরগ পোলাও।

এইবার নীরব হোটেলে খাননি কে কে হাত তুলেন!ভর্তা কাকে বলে কত প্রকার ও কি কি তার দৃষ্টান্তসহ বর্ণনা পাওয়া যাবে এই নিরাভরণ রসনাকেন্দ্রে।নীরবের পরাটা আর মগজ ভুনা পুরান ঢাকার ট্রেডমার্ক।আল রাজ্জাকস এর কাচ্চি আর খাসীর চাপও খুবই সুখ্যাত।মাহুতটুলির আদি আনন্দ বেকারীর অদ্ভুত মজার ফ্রুট কেক,বিস্কুট আর টানা পরাটা বা তন্দুর পরাটার কথা না বললেই নয়।এছাড়াও অলিগলিতে ছড়ানো অখ্যাত অথবা স্থানীয় ভাবে বিখ্যাত অনেক হোটেল আর দোকানের ভয়াবহ মজার কাবাব পরাটা বুন্দিয়া ফালুদা লাসসি নাকে চোখে সুড়সুড়ি দিবে পথ চলতে গেলেই।

আর দশটা ঢাকাইয়া পরিবারের মতই আমাদের বাড়িতে ভাত না থাকলেও যে জিনিষটা থাকে তার নাম বাখরখানি।সকালে দুধ বা চায়ের সাথে,মেহমান এলে ভুনা মাংস,হালুয়া বা মিষ্টির সাথে,শেষরাতে পড়তে পড়তে ক্ষুধা পেলে ফ্রীজ ঘেটে পাওয়া ঠান্ডা নিরামিষের সাথে,বাখরখানির কোন তুলনা আমার কাছে নেই।আমরা একে মাঝে মাঝে শুখা রুটিও বলি।টিপিক্যালটা ছাড়াও দুই রকমের বিশেষ বাখরখানি আছে।একটা পনির দেয়া আরেকটা চিনি আর নারিকেল দেয়া।দুইটাই অসাধারণ!

পুরান ঢাকার খাদ্যবন্দনা অপূর্ণ রয়ে যাবে চকবাজারকে বাদ দিলে।চকবাজারের আদি আলাউদ্দীন আর বোম্বে সুইটস এখনো অসমান্তরাল।আর চকবাজারের ইফতার নিয়ে কিছু কি বলার বাকি আছে?সব ইফতার সামগ্রীর শীর্ষে আছে সুতলি কাবাব আর “বড় বাপের পোলারা খায়”।এই দ্বিতীয় বস্তুর নামও বিদঘুটে আর রন্ধনপ্রণালীও।মুড়ি থেকে সুরু করে খাসীর মাংস,কি না দেয়া হয় এতে।কিন্ত এই কিম্ভুত জগাখিচুড়ি একবার খেলে এর বিদঘুটে নামটাও ভুলে যেতে বাধ্য যে কেউ!চকবাজারে সারা বছর পাওয়া যায় মাষকলাইয়ের বড়া,মুড়কি,মুড়ুলি,নিমকি,বাদাম মুড়কি,গোলগোল্লা আর এমনই সব অসাধারণ “দ্রুত খাদ্য”।

খাওয়া দাওয়ার কথা লিখতে লিখতে টের পাচ্ছি যে উদরের মূষিক প্রবর প্রবল নৃত্য করছে।আজকে রান্না করতে ইচ্ছা হলনা একদম।সুমন ভাইয়ার ডিম মঝার বা ল্যাটকা খিচুড়ি রেঁধে ফেলব নাকি ভাবতে থাকি।যদি দেখি এই ফাঁকে আমি যেগুলো ভুলে গেছি লিখতে সেগুলো জুড়ে দিয়ে পুরান ঢাকার খাদ্য খানার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন কেউ,অত্যন্ত বাধিত হব।শুভ রসনা বিলাস সবাইকে।

Written By: Bibagini

Photo Courtesy: Iftar Bazar, Narinda Tehari, Chalk Bazar Iftar

Leave a Reply